পারিবারিক কলহের জেরে শরীয়তপুর সদরে জিয়া সরদার (৪২) নামের এক মালয়েশিয়া প্রবাসী যুবককে রড দিয়ে পিটিয়ে ও ছুরি দিয়ে কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর ঠান্ডা মাথায় নিহতের হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে এবং হাড় থেকে মাংস কেটে আলাদা করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। শেষ রক্ষা হয়নি, অবশিষ্টাংশ ফ্রিজে লুকাতে গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী আসমা বেগম (৩৫)।
শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাতে উপজেলার পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের একটি বাড়ি থেকে অভিযুক্ত স্ত্রীকে আটক করে পালং মডেল থানা পুলিশ। এর আগে, গত মঙ্গলবার (১২ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে চন্দ্রপুর বাজারের পাশে আবু বকরের বাড়ির নিচ তলায় এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে শরীয়তপুরের মাহমুদপুর এলাকার মালয়েশিয়া প্রবাসী জিয়ার সঙ্গে পিরোজপুর জেলার জুপিয়া এলাকার আসমার বিয়ে হয়। এটি দুজনেরই দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ ও ঝগড়া চলে আসছিল।
ঘটনার দিন মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে জিয়া ঘরে বসে মুঠোফোনে কথা বলছিলেন। এ সময় স্ত্রী আসমা বেগম পেছন থেকে হঠাৎ দরজার পাশে থাকা লোহার রড দিয়ে জিয়ার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। জিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আসমা ক্রমাগত আঘাত করতে থাকেন, যার ফলে ঘটনাস্থলেই জিয়ার মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর আসমা ঘরে থাকা ছুরি দিয়ে জিয়ার চার হাত-পা শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেন। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাড় থেকে শরীরের মাংস কেটে পলিথিনে বেঁধে একটি প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতরে ভরে রাখেন।
লাশটি দীর্ঘ সময় ঘরে রাখায় দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে, আসমা প্লাস্টিকের ড্রামটি একটি অটোরিকশায় করে শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে মোতালেবের বউয়ের বাসায় নিয়ে যান। সেখান থেকে চার হাত-পা পলিথিনে ভরে নড়িয়া ফালান বেপারীর বাড়ির পাশে পদ্মা নদীর পাড়ে ফেলে আসেন। আর মাথাসহ শরীরের অন্যান্য অংশ সদরের আটং বৃক্ষতলা এলাকার একটি পুকুর পাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ শরীর থেকে কেটে নেওয়া মাংসের টুকরোগুলো পলিথিনে ভরে পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের একটি বাড়ির ফ্রিজে রাখার চেষ্টা করেন আসমা। এ সময় তার আচরণে সন্দেহ হলে স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন। খবর পেয়ে পালং মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আসমা বেগমকে আটক করে। পরবর্তীকালে আসমার দেওয়া তথ্যানুযায়ী বিভিন্ন স্থান থেকে হাত-পা, মাথা ও দেহের মাংস উদ্ধার করা হয়।
আটং এলাকার বাসিন্দা কাশেম বন্দুকছি জানান, আমি দোকানে ছিলাম। হঠাৎ শুনি আমাদের পুকুর পারে পুলিশ আসছে। গিয়ে দেখি বস্তাবন্দী একটি লাশ। পরে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
আটক হওয়ার পর স্বামী হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে আসমা বেগম বলেন, আমার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। তখন দরজার পাশে থাকা একটি রড দিয়ে তাঁর মাথায় বাড়ি দেই। সে পড়ে যায়, পরে দেখি তিনি মারা গেছেন। পরে ছুরি দিয়ে চার হাত-পা কাটি, শরীর কাটি, পরে পলিথিনে ভরে প্লাস্টিকের ড্রামে রাখি এবং বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেই। কেমনে কী করলাম আমি নিজেই জানি না।
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম জানান, পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় পারিবারিক কলহের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। হত্যাকারী আসমাকে আটক করা হয়েছে এবং তিনি প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সব দোষ স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নিহতের প্রথম স্ত্রীর সন্তান জিহাদ সরদার ক্ষোভ ও কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বাবাকে আসমা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। আমি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই, আসমার ফাঁসি চাই।
Leave a Reply